যে মৌলিক নীতিগুলো আজও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গঠন করে চলেছে
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামো কোনো সরকারের হঠাৎ সিদ্ধান্তে তৈরি হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে বহু বছরের নীতি সংস্কার, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়। এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর শাসনামল (১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬)।
এই সময়ে গৃহীত কিছু মৌলিক শিক্ষা সংস্কার আজও বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত হিসেবে কাজ করছে। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই সংস্কারগুলো ছিল বাস্তবভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন।
প্রাথমিক শিক্ষা: রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা
খালেদা জিয়ার প্রথম সরকার আমলে প্রাথমিক শিক্ষাকে সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষক নিয়োগ জোরদার করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করা হয়।
এই নীতির সবচেয়ে বড় অবদান হলো , প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তির উচ্চ হার অর্জন । সবকিছুর পেছনেই এই সময়ের নীতিগত ভিত্তি কাজ করেছে।
মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা: একটি যুগান্তকারী সামাজিক বিনিয়োগ
খালেদা জিয়া সরকারের সবচেয়ে আলোচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উদ্যোগ ছিল মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি, টিউশন ফি মওকুফ এবং নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতির শর্ত আরোপ করা হয়।
এর ফলে শুধু মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণই বাড়েনি, বরং বাল্যবিবাহ কমেছে, সামাজিক সচেতনতা বেড়েছে এবং বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা অর্জন করেছে। উন্নয়ন অর্থনীতিতে এটি একটি “high-return social investment” হিসেবে বিবেচিত হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারায় আনা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে একটি ব্যবধান ছিল। খালেদা জিয়ার সরকার এই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারায় আনার নীতি গ্রহণ করে।
দাখিল ও আলিমকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি–এর সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়।
এই সংস্কার ধর্মীয় শিক্ষাকে বাদ না দিয়ে বরং তাকে জাতীয় কাঠামোর ভেতরে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
জাতীয় পরীক্ষা ও মানদণ্ড করণ
খালেদা জিয়ার শাসনামলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাকে জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে আরও শক্তিশালী করা হয়। প্রশ্নপত্র, মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরীক্ষাগুলো দেশের সর্বজনগ্রাহ্য সার্টিফিকেশনে পরিণত হয়।
আজও বাংলাদেশের শিক্ষা ও চাকরি ব্যবস্থায় এসএসসি ও এইচএসসি সনদ একটি মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। যার ভিত্তি এই সময়ে সুসংহত হয়।
সরকারি–বেসরকারি ও এনজিও শিক্ষার সমন্বয়
এই সময়ে সরকার একটি বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দর্শন গ্রহণ করে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে, কিন্তু একাই সব পরিচালনা করবে না। বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও এনজিও পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, একই সঙ্গে পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
এমপিও ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষকদের সহায়তা প্রদান এই নীতিরই অংশ। আজ বাংলাদেশের যে মিশ্র (hybrid) শিক্ষা ব্যবস্থা , তার ভিত্তি এই সময়েই দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়।
কেন এই সংস্কারগুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ?
এই সংস্কারগুলোর শক্তি ছিল। এগুলো আদর্শবাদী স্লোগান নয়, বাস্তবভিত্তিক নীতি। এগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও এসব নীতির মূল কাঠামো টিকে গেছে।
খালেদা জিয়ার শিক্ষা সংস্কারগুলো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো তাৎক্ষণিক বিপ্লব না আনলেও, একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছে। যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী সরকারগুলো সংস্কার এগিয়ে নিতে পেরেছে।
রাজনৈতিক মতভেদ যাই থাকুক, নীতিনিরপেক্ষভাবে বলা যায়। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিক ভিত্তি নির্মাণে খালেদা জিয়ার অবদান দীর্ঘস্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
আজ যখন আমরা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবছি, তখন এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়। টেকসই পরিবর্তন আসে ধৈর্য, বাস্তবতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে।
